ফুটবলের ফলাফল হয়তো ড্র, কিন্তু ম্যাচ শেষে আচরণে আবারও বিশ্ববাসীর মন জিতে নিলেন জাপানের সমর্থকেরা। ভোররাতে অনুষ্ঠিত জাপান বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হলেও খেলার চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে ম্যাচ-পরবর্তী এক দৃশ্য—গ্যালারি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত জাপানি সমর্থকরা।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবার বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছিল এই ছবি। খেলা শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পড়ে থাকা আবর্জনা নিজেরাই তুলে পরিষ্কার করেছিলেন জাপানের সমর্থকেরা। সেই একই দৃশ্য এবার দেখা গেল আমেরিকার মাটিতেও।
ম্যাচ শেষে দেখা যায়, গ্যালারিতে পড়ে থাকা জলের বোতল, প্লাস্টিক, খাবারের মোড়ক ও চিপসের প্যাকেট সংগ্রহ করে বড় বড় প্লাস্টিক ব্যাগে ভরছেন জাপানি সমর্থকেরা। এরপর সেগুলি নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে তবেই স্টেডিয়াম ছাড়েন তাঁরা। এই দৃশ্যের ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।
এটি অবশ্য নতুন কোনও ঘটনা নয়। কাতার বিশ্বকাপের সময় নিজেদের দলের ম্যাচের পাশাপাশি অন্য দলের খেলা দেখতে গিয়েও একইভাবে গ্যালারি পরিষ্কার করতে দেখা গিয়েছিল জাপানি সমর্থকদের। অলিম্পিকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেও তাঁদের এই অভ্যাস বহুবার নজর কেড়েছে।
তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এ কি শুধুই লোক দেখানো, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা?
পরিসংখ্যান বলছে, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ জাপান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্লাস্টিক বোতল, অ্যালুমিনিয়াম ক্যান, স্টিল ক্যান, কার্ডবোর্ড ও কাগজজাত পণ্যের পুনর্ব্যবহারের হার জাপানে অত্যন্ত উচ্চ। পরিবেশ সচেতনতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের কাছে উদাহরণ।
এই মানসিকতার মূল রয়েছে জাপানের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে। সেখানে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো হয় যে, কোনও পাবলিক স্থান ব্যবহার করার পর সেটিকে পরিষ্কার অবস্থায় রেখে যাওয়া নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। জাপানের অধিকাংশ স্কুলে আলাদা পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকে না; শিক্ষার্থীরাই নিজের হাতে শ্রেণিকক্ষ, করিডর ও শৌচাগার পরিষ্কার করে। ফলে পরিচ্ছন্নতা তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে ওঠে।
জাপানে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ রয়েছে—“তাতসু তোরি আতো ও নিগোসাজু”, যার অর্থ, “উড়ে যাওয়ার সময় একটি পাখিও তার বসার জায়গা নোংরা করে যায় না।” এই দর্শনই যেন প্রতিফলিত হয় মাঠের গ্যালারিতে।
অন্যদিকে, আমাদের দেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই জনসাধারণের স্থানে আবর্জনা ফেলা, পানের পিক বা গুটখার দাগ, কিংবা যত্রতত্র ময়লা ফেলে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জাপানি সমর্থকদের এই আচরণ শুধুমাত্র প্রশংসার বিষয় নয়, বরং নাগরিক সচেতনতার এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও বটে।
ম্যাচের স্কোরলাইন হয়তো ড্র ছিল, কিন্তু দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও নাগরিক সংস্কৃতির লড়াইয়ে জাপানের সমর্থকেরা আবারও জয়ী হলেন।














