নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা
নতুন দিন – বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভায় বিদ্যুৎ বাজেটের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি জানালেন, আগামী জানুয়ারি মাস থেকে তিন মাস অন্তর নয়, প্রতি মাসে বিদ্যুতের বিল পাবেন সাধারণ গ্রাহকরা। পাশাপাশি গৃহস্থালির ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করা হবে না বলেও ঘোষণা করেন তিনি। বিদ্যুৎ সংক্রান্ত এই ঘোষণার পাশাপাশি বামপন্থী ও এসইউসিআইয়ের আন্দোলন নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিরোধীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের সমস্যার সমাধান করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী জানুয়ারি থেকে তিন মাসের পরিবর্তে প্রতি মাসে বিদ্যুতের বিল দেওয়া হবে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের একসঙ্গে বড় অঙ্কের বিলের চাপ কমবে বলে তিনি জানান। স্মার্ট মিটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গৃহস্থালির ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বামপন্থী ও এসইউসিআইয়ের আন্দোলন নিয়ে কটাক্ষ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনও বিভ্রান্তি তৈরি করা উচিত নয়। সরকার মানুষের প্রয়োজন ও সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পাশাপাশি বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার দুর্বল নয় এবং কোনও উসকানিতেই উন্নয়নের কাজ থেমে থাকবে না। বক্রেশ্বর ও কোলাঘাটে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের অধীনে বক্রেশ্বর ও কোলাঘাটে নতুন প্রকল্প গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নতুন সুপার ক্রিটিক্যাল প্রকল্প তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজ্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও বক্রেশ্বর জলাধারে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। কোলাঘাটেও নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ প্রকল্পের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও শক্তিশালী হবে বলে দাবি সরকারের। বিদ্যুৎ সংস্থাকে শেয়ার বাজারে আনার পরিকল্পনা বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে লাভজনক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্থার আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংস্থার আয় থেকে রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন কয়লাখনি থেকে অতিরিক্ত কয়লা বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। কৃষকদের জন্য বিদ্যুৎ ভর্তুকির ঘোষণা কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার কথা জানান তিনি। পিএম কুসুম প্রকল্পের আওতায় কৃষি ফিডারগুলিকে সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি কৃষকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে রাজ্যজুড়ে চার্জিং স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থাকে উৎসাহ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা সম্প্রসারণ
রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সহযোগিতায় বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলায় বিদ্যুৎ পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হবে।
পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্প নিয়েও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ডিভিসির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বড় ক্ষমতার এই প্রকল্প তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। আইসিডিএস কেন্দ্র ও স্কুলে বিশেষ উদ্যোগ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ দফতরের মাধ্যমে একাধিক উদ্যোগের ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের প্রায় ৫৪ হাজার আইসিডিএস কেন্দ্রে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ, আলো এবং পাখার ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে শিশু ও কর্মীদের পরিষেবা আরও উন্নত হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ দফতরের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে এক হাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রাহক পরিষেবা আরও উন্নত করার পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য গ্রামীণ এলাকায় নাইট মোবাইল ভ্যানের সংখ্যা বাড়ানোর কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি কাস্টমার কেয়ার পরিষেবায় কর্মীর সংখ্যাও বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য মানুষের কাছে দ্রুত ও উন্নত পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। বিদ্যুৎ পরিষেবা থেকে শুরু করে পরিকাঠামো উন্নয়ন সব ক্ষেত্রেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বিধানসভার বক্তব্যের শেষে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের আক্রমণ করে বলেন, সরকার রাজনৈতিক বিভাজনের পথে না গিয়ে উন্নয়নের কাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী দিনের বাজেটে রাজ্যের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার আরও বিস্তারিত ছবি পাওয়া যাবে বলেও তিনি জানান। বিদ্যুৎ বিলের নতুন নিয়ম, স্মার্ট মিটার নিয়ে সিদ্ধান্ত এবং একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণায় রাজ্যের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নতুন দিশা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।





































