রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধী দলনেতা পদকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতির এজলাসে।

নতুন দিন – দল থেকে বহিষ্কৃত এক বিধায়ককে কীভাবে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্টে সরব হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ও প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আদালতে তিনি বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
সম্প্রতি বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোস ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। মামলার শুনানিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্তি দেন, যে ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত, তাঁকে কীভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে, তা আইন ও বিধানসভা রীতিনীতির পরিপন্থী।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন কোনও ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক অবস্থান ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। তাঁর দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল।
সেই অবস্থায় দলের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে অন্য কাউকে ওই পদে বসানো হলে তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী নয়, সাংবিধানিক প্রশ্নও তৈরি করে।
আদালতে তিনি আরও জানান, স্পিকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কার্যত বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিধানসভা সংক্রান্ত একাধিক সরকারি ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতেও তাঁকে সেই মর্যাদাতেই দেখা গিয়েছে। স্পিকারকে স্বাগত জানানো, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং বিধানসভার বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি বিরোধী দলনেতার ভূমিকাতেই উপস্থিত ছিলেন।
ফলে আচমকা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওই পদে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি। শুনানির সময় বিচারপতি কৃষ্ণ রাওও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি জানতে চান, যদি কোনও রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সদস্যকে বহিষ্কার করে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি কীভাবে দলের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সাংবিধানিক পদে আসীন হতে পারেন? বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
এছাড়াও বিচারপতি স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর কেন বিধানসভার পক্ষ থেকে কোনও পৃথক বিজ্ঞপ্তি বা আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করা হয়নি। সাধারণত এমন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আদালত জানতে চায়। অন্যদিকে, মামলাকারী পক্ষের তরফে বিধানসভা শুরুর আগে নতুন করে আসন সংরক্ষণ বা আসন বিন্যাসে কোনও পরিবর্তন না করার নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়।
তবে সেই আবেদনে এই মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হয়নি আদালত। রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য। তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, মামলার গ্রহণযোগ্যতা, স্পিকারের সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে একটি সংক্ষিপ্ত হলফনামা দাখিল করার অনুমতিও চান তিনি। আদালত রাজ্য সরকারের সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। পাশাপাশি মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৬ জুন।
ওই দিন রাজ্যের পক্ষ থেকে বিস্তারিত অবস্থান জানানো হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মামলা শুধুমাত্র একজন বিধায়কের পদ বা মর্যাদার প্রশ্ন নয়; বরং বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, স্পিকারের ক্ষমতার সীমা এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফলে আগামী ১৬ জুনের শুনানির দিকে এখন নজর রাজ্যের রাজনৈতিক ও আইনি মহলের। বিরোধী দলনেতা পদকে ঘিরে এই আইনি লড়াই ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে স্পিকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে কি না এবং বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব নিয়ে চলতে থাকা বিতর্কের পরিণতি কী হবে।

























